‘সেখানে রাত ৩টায় একটি মেয়ে ঘুরে বেড়ালেও কেউ তার গায়ে হাত দেবে না’



 সিঙ্গাপুরে পরিবারসহ বেড়াতে গিয়ে উঠেছি কাজিনের বাসায়। একবার রাস্তায় বের হয়ে দুপুর বেলা নির্জন এক ফুটপাতের যাত্রী ছাউনিতে পাঁচ/ছয় বছরের ফুটফুটে পুতুলের মতো এক মেয়েকে একা বসে থাকতে দেখে কাজিনকে বললাম, বোধহয় বাচ্চাটি হারিয়ে গেছে। সাহায্য দরকার, বলেই তার দিকে এগিয়ে যেতেই পেছন থেকে কাজিন আমার জামা টেনে ধরে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল, ভাইয়া ভাইয়া কাছে যাবেন না। বাচ্চা হারায়নি। এখানে কেউ হারায় না।

এই বাচ্চা রাত ৩টায় একা বসে থাকলেও চিন্তা নেই। সে হয়তো কারো জন্য অপেক্ষা করছে, বরং আপনি কাছে গেলেই বিপদে পড়তে পারেন। টেরই পাবেন না, পেছনে দেখবেন পুলিশ এসে দাঁড়িয়ে গেছে। সেখানে রাত ৩টায় একা একজন মেয়ে সারা শহর ঘুরে বেড়ালেও কেউ তার গায়ে হাত দেবে না, পোশাক যতই সংক্ষিপ্ত হোক না কেন। বাস ট্রামে, রেলে দেখেছি সবার দৃষ্টি অবনত থাকে। জগতের যে কটি উন্নত দেশে গিয়েছি, সবখানে একই বিষয় লক্ষ করেছি।

এদের অনেক দেশের প্রায় ৬০% মানুষ ধর্মহীন, বাকি অন্যান্য ধর্ম। মুসলমানের সংখ্যা মাত্র ২/১%। এরা বুক ফুলিয়ে ঘোষণা দেয়, রাতে পথচারী একাকী একটি মেয়ে সম্পূর্ণ নিরাপদ। ৯০% মুসলমানের দেশে অনেকেই নারী নির্যাতনের জন্য দায়ী করে মেয়েদের পোশাক এবং চালচলনকে। অথচ বোরখা অথবা শালীন পোশাক কিংবা ছয় বছরের একটি মেয়ে শিশুও বাদ যাচ্ছে না নির্যাতন থেকে।

শালীনভাবে চলার কথা বলা আছে ধর্মে। তা কে পালন করবে আর না করবে সেটা তার ব্যাপার। তার ব্যক্তিগত বা পারিবারিক পাপ। এটা কোনোভাবেই নারী নির্যাতনকে জাস্টিফাই করে না বা করা উচিত নয়। এক পাপকে ঘৃণা করতে গিয়ে তো আর একটি বড় পাপ করা যাবে না। কেউ অশালীনভাবে রাস্তায় যাতে বের হতে না পারে, তা রোধ করার দায়িত্ব পরিবারের, সমাজের। তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে নয়। শতভাগ পর্দা বা শালীন বাধ্যতামূলক করা দেশেও কিন্তু নারী নির্যাতন হচ্ছে অনেক ঘরে।

অসভ্য তো বর্বর হবেই। আবার আপনি বর্বর হলে নিজেকে সভ্য দাবি করতে পারেন না। অশিক্ষিত বর্বরের চেয়ে শিক্ষিত বর্বর অনেক বেশি ধ্বংসাত্মক। চোখের সামনে হঠাৎ অপূর্ব সুন্দরি যুবতী কাপড়হীন একাকী এক নারী দাঁড়ালে কজন পুরুষ পারবেন অত্যন্ত ধিরস্থির এবং শান্তভাবে নিজের গায়ের কাপড় খুলে দিয়ে পরম যত্নে তাকে আগলে রাখতে? যারা পারবেন, তারা সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে। তাদের কোথাও তর্কের দরকার নেই।

বুকে হাত দিয়ে যারা বলতে পারবেন না, তারা আছেন শুধু সুযোগের অপেক্ষায়। তারা নির্যাতনকে নানা বাহানায়, নানা কায়দায় জাস্টিফাই করার জন্য লেগে থাকবেন, এটাই স্বাভাবিক। আর যদি সবাই মহাপুরুষ হন, তবে অন্যায়কে জাস্টিফাই করার তো একজন বান্দাও থাকার কথা নয় জগতে। নির্যাতনকারীর থাকে না কোনো ধর্ম, লজিক, স্থানকাল পাত্র। থাকে না শালীন-অশালীনতার ভেদাভেদ। অথচ তার সেই জঘন্য কাজের লজিক উপস্থাপন বা জাস্টিফাই করার সংখ্যা এদেশে এত বেশি যে রীতিমত হতবাক হতে হয়।

নিজের পরিবারের বাইরে জগতের সব নারীদের প্রকৃত মা-বোন ভাবা পুরুষের সংখ্যা কি আসলেই কম! বিদেশ গিয়ে প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগিয়েছি শুধু শিখতে। আকাশ বাতাস, রাস্তাঘাট, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা, যোগাযোগ ব্যবস্থা, বাজার ঘাট, তাদের চালচলন, ব্যবহার, কথা বলার ভঙ্গিমা, নদী-নালা, গাছপালা… তাকিয়ে দেখেছি আর ভেবেছি, আহা!! কবে হবে আমাদের সেই সোনার দেশ! কবে হবে? kalerkantho

-মাহবুব কবীর মিলনের ভেরিফায়েড ফেসবুক ওয়াল থেকে

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

0 মন্তব্যসমূহ